‘Yesterday is history, tomorrow is a mystery, today is a gift.’ বিখ্যাত এই উক্তিটির গভীরতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বইয়ের পাতায়—যা অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝে এক অভূতপূর্ব সেতু বন্ধন গড়ে দেয়। সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল, সাথে ছিল মৃদু গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও মনস্থির করেছিলাম ফেয়ারভিউ পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শনে যাব।
মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর বৃষ্টির উপেক্ষা করেই একসময় আমরা লাইব্রেরির দরজায় এসে উপস্থিত হলাম। বাইরের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া পেরিয়ে ফেয়ারভিউ পাবলিক লাইব্রেরির প্রবেশের দরজাটা খুলতেই এক অদ্ভুত আলোময় উষ্ণতা শরীর ও মনকে ছুঁয়ে গেল। ভেতরে ঢুকতেই চোখ পড়ল কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলের দিকে—যারা গভীর মগ্নতায় কম্পিউটার গেমস খেলছিল। কিছুক্ষণ পর নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়াতে কর্তৃপক্ষ তাদেরকে গেম শেষ করার অনুরোধ জানালেন এবং ছেলেরা ভদ্রভাবে চলে গেল। ইতিমধ্যে ডেস্ক থেকে একটি স্লিপ নিয়ে এসে আবরার তার কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রিন্ট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই সুযোগে আমি আর পিয়াসী লাইব্রেরির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখতে লাগলাম। লাইব্রেরির ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে চমৎকার একটি চিলড্রেনস কর্নার যেটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। শিশু কর্নার থেকে মা -বাবার সাথে শিশুরা বই নিয়ে মহা আনন্দে বাসায় ফিরে যাচ্ছে। শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের জন্য সেখানে রয়েছে বই ও ম্যাগাজিনের এক বিশাল কালেকশন। কেউ গভীর মনোযোগে বই পড়ছেন। বিভিন্ন সেলফে সাজানো বইয়ের এই বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ দেখে মনটা মুগ্ধতায় ভরে উঠল।
এই প্রাণবন্ত আবহের মাঝে দেয়ালের একটি লেখা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করল- ‘Books make life’ অর্থাৎ বই জীবন গড়ে। খুব ছোট এই বাক্যটির গভীরে যে কত বড় সত্য লুকিয়ে আছে—তা একটু ভাবলেই অনুধাবন করা যায়। এটি আসলে ব্যক্তি, সমাজ তথা একটি পুরো জাতির উত্তরণের মহাকাব্য। একটি লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার হলো সমাজের মস্তিষ্কের মতো। এটি কেবল কাগজের স্তূপ নয়, বরং মানুষের হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। লাইব্রেরিতে এসে মানুষ যখন নানা বিষয়ের বই পড়ে, তখন তার মনের সংকীর্ণতা দূর হয় এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনার উদয় হয়। এটি এমন এক উন্মুক্ত ও পবিত্র স্থান যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শিক্ষার আলোয় একত্রিত হয়—যা সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে পারস্পরিক সম্প্রীতি বাড়ায়। শৈশব থেকেই লাইব্রেরীর সান্নিধ্যে আসা শিশুরা সৃজনশীল ও মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে, যার এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি আমি প্রত্যক্ষ করলাম ফেয়ার ভিউ লাইব্রেরিতে বই হাতে থাকা মা ও শিশুর সেই মধুর দৃশ্যে।
পড়ার এই অভ্যাসই মূলত একটি জাতিকে উন্নত স্তরে রূপান্তরিত করে, যার বাস্তব সাক্ষী আমি নিজেই। ২০২৪ সালের একটি স্মৃতির কথা খুব মনে পড়ে, আমাদের দেশে ফেরার জন্য তিনটি কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল— গ্র্যান্ড প্রেইরি থেকে ক্যালগেরি, ক্যালগারি থেকে টরন্টো এবং টরন্টো থেকে বাংলাদেশ।
লক্ষ্য করলাম, প্রথম ফ্লাইটে ওঠার পর যাত্রীদের অধিকাংশ জনই ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে কিংবা সরাসরি বই ও পত্রিকা পড়ছেন। ক্যালগেরি থেকে যখন টরন্টোগামী ফ্লাইটে উঠলাম, সেখানেও একই দৃশ্য-চারপাশে শুধু পড়ার নীরব আবহ। এরপর টরন্টো বিমানবন্দরে এসে বাংলাদেশ বিমান অভিমুখে আমাদের ফ্লাইটটি কিছুটা বিলম্বিত হওয়ায় আমরা এয়ারপোর্টের চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম। সেখানে দেখলাম, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে যারা শিক্ষার্থী, তারা বিভিন্ন কোণে বসে ল্যাপটপ ও মোবাইলের স্ক্রিনে নিজেদের প্রয়োজনীয় পড়া সারছে। এর মাঝেই এক কানাডিয়ান পরিবার আমার নজর কাড়ল; একজন মা তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে দূরপাল্লার ফ্লাইটে যাবেন, যাত্রার এই অন্তর্বর্তীকালীন বিরতিতেও তিনি ব্যাগ থেকে বই-খাতা বের করে দুই ছেলেকে কিছু হোমওয়ার্ক করতে দিলেন।
বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, ছেলে দুটিও কোনো অনীহা না দেখিয়ে অত্যন্ত আনন্দের সাথে কাজগুলো সম্পন্ন করে ফেলল। অথচ দুঃখজনকভাবে যখন আমরা বাংলাদেশ বিমানে চড়ে বসলাম, তখন চারপাশে এই পঠন-পাঠনের চেনা দৃশ্যটি আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি যত বেশি পড়েছে, তারা চিন্তাভাবনা ও সভ্যতায় তত বেশি উন্নত হয়েছে। শুধু খনিজ সম্পদ বা অর্থ দিয়ে নয়, বরং চিন্তার শক্তি দিয়ে যারা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করেছে এবং করছে, তাদের মধ্যে কয়েকটি দেশের কথা বিশেষভাবে বলা যায়। যেমন যুক্তরাজ্যের শিল্প বিপ্লবের সমান্তরালে যে বিশ্বজোড়া প্রভাব ছিল, তার মূলে ছিল তাদের গভীর পঠন সংস্কৃতি। ব্রিটিশ লাইব্রেরিসহ দেশটির আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা পাবলিক লাইব্রেরিগুলো সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জনের পথকে সুগম করেছিল, যা নিয়ে বিখ্যাত স্কটিশ দার্শনিক টমাস কার্লাইল বলেছিলেন, ‘একটি আদর্শ লাইব্রেরিই হলো প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়।’ একইভাবে আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ১৭৩১ সালে দেশটির প্রথম সাবস্ক্রিপশন লাইব্রেরি স্থাপন করেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকদের সচেতন হতে হলে পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আজ আমেরিকার সমৃদ্ধির পেছনে তাদের এই বিশ্বমানের লাইব্রেরি ব্যবস্থা ও গবেষণা সংস্কৃতির অবদান অনস্বীকার্য। আবার দূর প্রাচ্যের দেশ জাপানের মেইজি পুনর্জাগরণের যুগে তারা ‘জ্ঞান অনুসন্ধান করো বিশ্বজুড়ে’ স্লোগানকে ধারণ করে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে লাইব্রেরিগুলো সমৃদ্ধ করেছিল।
জাপানিদের ট্রেনে বা পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে বই পড়ার এই বিশেষ অভ্যাস—যা ‘তাচিয়োমি’ নামে পরিচিত, তা-ই আজ তাদের প্রযুক্তির শীর্ষে নিয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশ এবং আধুনিক শিক্ষার রোল মডেল ফিনল্যান্ডের ওডি সেন্ট্রাল লাইব্রেরি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক লাইব্রেরি হিসেবে সমাদৃত। ফিনিশ নাগরিকরা বিশ্বাস করেন, লাইব্রেরিতে বিনিয়োগ মানেই দেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধ সংগ্রহে লিখেছিলেন, ‘লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।’ লাইব্রেরি কেবল বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করার এবং আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার এক অনন্য মাধ্যম। একটি রাষ্ট্র তখনই অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হয়, যখন তার নাগরিকেরা দক্ষ ও জ্ঞানসমৃদ্ধ হয়। লাইব্রেরি দেশের গবেষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণার রসদ জুগিয়ে রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতিতে প্রধান ভূমিকা রাখে, কারণ সচেতন নাগরিক ছাড়া সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
মেঘ কেটে যেমন একসময় সোনালী সূর্য ওঠে, তেমনি বইয়ের আলো মানুষের মনের ভেতরের সব অন্ধকার, অজ্ঞতা ও জড়তাকে দূর করে দেয়। ‘Books make life’ এই চিরন্তন সত্যটি কেবল কোনো লাইব্রেরীর দেয়ালে শোভা পাওয়ার মতো বাণী নয়, এটি আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। একটি জ্ঞানভিত্তিক, প্রগতিশীল এবং উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে হলে আমাদের আবারও লাইব্রেরিমুখী হতে হবে, পড়ার অভ্যাসকে ফিরিয়ে আনতে হবে প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যাসে। ফেয়ারভিউ পাবলিক লাইব্রেরির মতো পৃথিবীর বুকে প্রতিটি লাইব্রেরি হয়ে উঠুক একেকটি আলোকবর্তিকা—যা আমাদের জীবনকে করবে সুন্দর, সার্থক ও সমৃদ্ধ।
ড. মো. আবদুল ওয়াদুদ খান
শিক্ষক ও গবেষক